NirobDhoni
মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ তীব্র হওয়ায় পাকিস্তান কঠিন কূটনৈতিক দ্বিধার মুখে পড়েছে। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ—সব মিলিয়ে দেশটির অবস্থান জটিল হয়ে উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব এখন পাকিস্তানের রাজনীতি ও কূটনীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি জোটের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামাবাদের ওপর কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপ বাড়ছে।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যবর্তী একটি প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে চীনের মধ্যস্থতায় যে সমঝোতা হয়েছিল, তাতে ইসলামাবাদেরও কিছু ভূমিকা ছিল। কিন্তু বর্তমান সংঘাতে সেই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে দেশের অভ্যন্তরেও চাপ বাড়ছে। আফগান সীমান্তে তালেবানের সঙ্গে সংঘাত, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় বিদ্রোহ দমন এবং ভারতের সঙ্গে তিক্ত সম্পর্ক—সব মিলিয়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
করাচিতে মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ এবং শিয়া অধ্যুষিত এলাকায় কারফিউ জারি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। সরকার বিক্ষোভ দমনে কড়াকড়ি আরোপ করলেও জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে বলে বিভিন্ন মহলের অভিযোগ।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনায় পাকিস্তান কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিক্রিয়া জানালেও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার পর দ্রুত নিন্দা জানিয়েছে ইসলামাবাদ।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সংকট
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান নতুন এক কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে পড়েছে। একদিকে ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন ইসলামাবাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বহুমুখী চাপ
দেশটির নীতিনির্ধারকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে কয়েকটি কারণে—
আফগান সীমান্তে তালেবানের সঙ্গে উত্তেজনা
বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় বিদ্রোহী তৎপরতা
ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের তিক্ত সম্পর্ক
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে আন্তর্জাতিক চাপ
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান নতুন কোনো আঞ্চলিক অস্থিরতা সামাল দিতে পারবে কি না—তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ঘনিষ্ঠ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান আসিম মুনিরের যোগাযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গাজা ইস্যু ও আফগানিস্তান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
তবে এই ঘনিষ্ঠতা দেশের ভেতরে সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে। কিছু বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিক পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানকে বিতর্কিত বলে মন্তব্য করেছেন।
অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ
পাকিস্তানের ভেতরে ইতিমধ্যে বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। করাচিতে মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। প্রশাসন করাচি ও লাহোরের কিছু এলাকায় সড়ক বন্ধ এবং শিয়া অধ্যুষিত এলাকায় কারফিউ জারি করে প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে।
সামনে কী
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরায়েল সফর ইসলামাবাদের জন্য নতুন কূটনৈতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে অবস্থান নির্ধারণে পাকিস্তানের দোদুল্যমানতা দেশের ভেতরেও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
মূল বিশ্লেষণ: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পাকিস্তানকে একই সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। কিন্তু বর্তমান সংঘাত সেই নীতিকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে। একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সীমান্ত ও আঞ্চলিক বাস্তবতা—এই দুইয়ের মধ্যে অবস্থান নির্ধারণ সহজ নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ চাপ। শিয়া-সুন্নি সংবেদনশীলতা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। যদি সরকার কোনো পক্ষের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে, তবে তা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে একটি পাল্টা যুক্তিও আছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, পাকিস্তান যদি সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার গুরুত্ব বাড়তে পারে। এতে আঞ্চলিক প্রভাবও বৃদ্ধি পেতে পারে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রেখে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ধরে রাখা।
এমডি রহমান
ফোন : +1 4647335595, ই-মেইল: protidhoni24@gmail.com