MezDhoni
দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করে রাখার নীতি অনুসরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সেই অবস্থানে পরিবর্তনের আভাস মিলছে। সামরিক জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বৈঠক, কয়েকজন ব্যবসায়ীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিরল খনিজ সম্পদ নিয়ে ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাহলে কি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চেয়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্প?
মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বরফ কি শেষ পর্যন্ত গলতে শুরু করেছে? সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
গত সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। এর পাশাপাশি দেশটির সামরিক সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যবসায়ীর ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে।
২০২১ সালে নির্বাচিত নেত্রী অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর ওয়াশিংটন ও নেপিদোর মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সামরিক সরকারের সহযোগীদের বিরুদ্ধে একের পর এক নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে সেই দীর্ঘদিনের নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গত ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদো সফর করেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণাবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্স।
সফরকালে তিনি সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল জুন মাসে আটক মার্কিন নাগরিক অ্যাডাম ক্যাস্টিলোর মুক্তির ব্যবস্থা করা। স্থানীয় আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে বিরোধের জেরে তাঁকে আটক করা হয়েছিল।
তবে বিষয়টি শুধু একজন মার্কিন নাগরিকের মুক্তি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে মনে করছেন না পর্যবেক্ষকেরা।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের জান্তাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা মাইকেল ভ্যান্স।
ধারণা করা হচ্ছে, বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আরও বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এর আগে জুন মাসে জাপানের টোকিওতে মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ভ্যান্স। চলতি অক্টোবরেও সেখানে তাঁর যোগাযোগ হয়েছে। পাশাপাশি সামরিক শাসনের বিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন।
মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পরিবর্তনের ইঙ্গিত অবশ্য আরও আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ যখন চরমে, তখন মিয়ানমারসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশের নেতার কাছে ব্যক্তিগত চিঠি পাঠান তিনি।
চিঠিতে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে মিয়ানমারের পণ্য রপ্তানির ওপর ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তে অনেক দেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেও মিন অং হ্লাইংয়ের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তিনি বরং ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুত একটি চিঠি পাঠান।
চিঠিতে বিশ্বের বৃহত্তম বাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার সুযোগকে উৎসাহব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তাঁর ভাষায়, দেশের সমৃদ্ধির পথে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে ট্রাম্প একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকের মতো দৃঢ় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রশংসা নিছক সৌজন্য ছিল না। এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা।
সামরিক অভ্যুত্থান এবং এর পরবর্তী গৃহযুদ্ধ মিন অং হ্লাইংকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রায় একঘরে করে ফেলেছে।
তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ারও বিষয় হয়েছে।
রাশিয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে চীন ছাড়া অধিকাংশ প্রভাবশালী রাষ্ট্রের কাছ থেকেই তিনি কার্যত দূরত্বের মুখোমুখি হয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরাসরি চিঠি পাওয়া তাঁর জন্য ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ।
বিশেষ করে ট্রাম্প যখন তাঁকে অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের মতো সম্মানসূচক সম্বোধন করেন, তখন সেটিকে নিজের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার সম্ভাব্য স্বীকৃতি হিসেবেই দেখার সুযোগ পান মিয়ানমারের সামরিক শাসক।
অথচ সেই চিঠিতে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের মানবিক বিপর্যয়, গণতন্ত্র ধ্বংস কিংবা অং সান সু চির কারাবাসের কোনো উল্লেখ ছিল না।
ট্রাম্পের চিঠি পাওয়ার একই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী লবিং প্রতিষ্ঠান ডিসিআইয়ের (DCI) সঙ্গে ৩০ লাখ ডলারের চুক্তি করে মিয়ানমারের সামরিক সরকার।
ওয়াশিংটনভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি এর আগেও ২০০২ সালে মিয়ানমারের তৎকালীন সামরিক সরকারের ভাবমূর্তি উন্নয়নের কাজে যুক্ত ছিল।
পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বিতর্কিত রাজনৈতিক লবিস্ট রজার স্টোনকেও নিয়োগ দেয় সামরিক সরকার। তাঁর জন্য নির্ধারিত পারিশ্রমিক মাসে ৫০ হাজার ডলার।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পরিকল্পিতভাবে অর্থ ব্যয় করছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার।
একই সময়ে ওয়াশিংটনে সক্রিয় ছিলেন সাবেক মার্কিন মেরিন সেনাসদস্য ও ট্রাম্প-সমর্থক অ্যাডাম ক্যাস্টিলো।
ইয়াঙ্গুনের আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের সভাপতির পদ থেকে সদ্য বিদায় নেওয়া ক্যাস্টিলো ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সহযোগীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, মিয়ানমারের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ শুরু করার সময় এসেছে।
তাঁর মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সামরিক সরকারকে বিচ্ছিন্ন রাখার মার্কিন নীতি কার্যকর হয়নি।
নিজের লেখা Finding Our Voice: A Story of Leadership in Crisis and the American Spirit Abroad বইয়ে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, মিয়ানমারকে কেবল নৈতিকতার প্রশ্নে বিচার করলে হবে না। দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্বার্থও জড়িত।
তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেন, কীভাবে যুদ্ধ কিংবা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার পথে না গিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ কমানো সম্ভব হয়।
মিয়ানমারকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন আগ্রহের অন্যতম কারণ দেশটির বিপুল বিরল খনিজ সম্পদ।
বর্তমান বিশ্বে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সামরিক সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে বিরল মৃত্তিকা খনিজ বা রেয়ার আর্থ অপরিহার্য।
এই খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থায় চীনের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্পের শুল্কনীতির পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে চীন বিরল খনিজের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরশীলতার বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।
এরপর থেকেই বিকল্প উৎস খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দিতে শুরু করে ওয়াশিংটন।
মিয়ানমারে রয়েছে এসব মূল্যবান খনিজের বিপুল মজুত। বর্তমানে সেখানকার অধিকাংশ খনিজ উত্তোলন করা হচ্ছে মূলত চীনের চাহিদা পূরণের জন্য।
ফলে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাব্য সুযোগ দিতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি এত সহজ নয়।
বিরল খনিজের বড় অংশ রয়েছে মিয়ানমারের এমন সব অঞ্চলে, যেখানে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
এসব সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো খনিজ উত্তোলন করছে। পরে সেগুলো সীমান্ত পেরিয়ে চীনে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সেখানে প্রবেশ করবে কিংবা সরাসরি খনিজ সংগ্রহ করবে, তার কোনো সহজ সমাধান নেই।
মিয়ানমার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায় নির্বাচনের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নতুন নির্দেশনায়।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি বিশ্বজুড়ে মার্কিন দূতাবাসগুলোকে জানানো হয়, অন্য দেশের নির্বাচনের সুষ্ঠুতা, বৈধতা বা গণতান্ত্রিক মান নিয়ে প্রকাশ্যে মূল্যায়ন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এই নীতির প্রভাব দেখা যায় মিয়ানমারের সাম্প্রতিক নির্বাচনেও।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ব্যাপক সমালোচিত নির্বাচনের মাধ্যমে সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং বেসামরিক রাষ্ট্রপতির পরিচয় গ্রহণের পথ তৈরি করেন।
বেশির ভাগ পশ্চিমা সরকার নির্বাচনটিকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে স্বীকৃতি দেয়নি।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো প্রকাশ্যে এর বৈধতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেনি।
অথচ কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন দেশের নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মন্তব্য করা ছিল ওয়াশিংটনের পরিচিত কূটনৈতিক অবস্থান।
এবার সেই নীরবতা অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে।
এরপর বাইডেন প্রশাসনের সময় নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা কয়েকজন ব্যবসায়ীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তও নতুন মার্কিন নীতির ধারণাকে আরও জোরালো করে।
ওয়াশিংটনের লবিং প্রতিষ্ঠান ডিসিআই সম্প্রতি তাদের এক প্রকাশনায় দাবি করেছে, মিয়ানমারকে বিচ্ছিন্ন রাখা এবং নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের যুগ শেষ হতে চলেছে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, ট্রাম্প ভিন্ন পথ অনুসরণের সাহস দেখাচ্ছেন।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের সবাই মনে করছেন না যে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে পুরোপুরি গ্রহণ করে নিয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমারবিষয়ক উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সির মতে, সংবাদ শিরোনামে যত বড় পরিবর্তন মনে হচ্ছে, বাস্তবে ততটা ঘটেনি।
তিনি মনে করিয়ে দেন, মিন অং হ্লাইং এখনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন।
তাঁর মতে, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগের মাত্রা এবং বৈঠকের স্থান।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এখন সরাসরি নেপিদো যাচ্ছেন। মিন অং হ্লাইং দীর্ঘদিন ধরেই এমন যোগাযোগ চাইছিলেন।
কিন্তু তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য হবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করানো। সেটি অর্জন অনেক বেশি কঠিন হবে বলে মনে করেন হর্সি।
মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই বড় প্রভাব ফেলেছে।
সেটি হলো মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সংকুচিত করা।
এর ফলে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী বিরোধী গোষ্ঠী, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং শরণার্থীদের জন্য মার্কিন সহায়তা অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির সাধারণ মানুষের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া প্রায় চার হাজার মিয়ানমারের নাগরিকের অস্থায়ী সুরক্ষিত অবস্থান বা টেম্পোরারি প্রটেক্টেড স্ট্যাটাস (TPS) প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এসব মানুষকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলে তাঁদের অনেকেই কারাবাস, নির্যাতন কিংবা আরও ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়তে পারেন।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তন শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কেই নয়, সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো মিয়ানমারভিত্তিক আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা চক্র।
দেশটির সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বড় বড় প্রতারণাকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। এসব কেন্দ্র থেকে বিশ্বের নানা দেশের মানুষের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের সামরিক সরকার কয়েকটি বড় প্রতারণাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি।
বরং অনেক অপরাধী চক্র অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকায় ছোট ছোট কেন্দ্রে তাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে দিয়েছে।
এ ছাড়া এসব প্রতারণা নেটওয়ার্কের অনেকগুলো সামরিক সরকারের মিত্র স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহযোগিতায় পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের কাছ থেকে এই সমস্যা সমাধানে কতটা আন্তরিক সহযোগিতা পাওয়া যাবে, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লোই ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক পরিচালক হান্টার মার্সটনের মতে, মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা করা নিজে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেই আলোচনায় ওয়াশিংটন কী চাইছে এবং বিনিময়ে কী ছাড় দিচ্ছে।
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এই যোগাযোগকে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান হামলা বন্ধ করা এবং সংঘাত কমানোর মতো বিষয়ে কাজে লাগানো।
একই সঙ্গে গণতন্ত্রপন্থী বিরোধী শক্তি ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ মিয়ানমারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো এসব গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অনলাইন প্রতারণা দমনের ক্ষেত্রেও শুধু সামরিক সরকারের ওপর নির্ভর না করে চীনসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বিশেষ করে প্রতারণা চক্রগুলোর অর্থের উৎস এবং আর্থিক লেনদেন বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন এই বিশ্লেষক।
মিয়ানমারকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
মিয়ানমারের সামরিক সরকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি চায়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে বিরল খনিজ সম্পদ, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা।
কিন্তু দুই দেশের স্বার্থের এই সমীকরণ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
কারণ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান গৃহযুদ্ধ, বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং চীনের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব রাতারাতি বদলে দেওয়া সম্ভব নয়।
তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মনোযোগের বড় অংশ দখল করে রেখেছে।
এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক নীতি বাস্তবায়নের মতো রাজনৈতিক মনোযোগ ট্রাম্প প্রশাসন দিতে পারবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—ওয়াশিংটন ও নেপিদোর মধ্যে যোগাযোগের নতুন পথ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই যোগাযোগ শেষ পর্যন্ত সামরিক সরকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে, নাকি মিয়ানমারের মানুষের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতার সুযোগ সৃষ্টি করবে, তার উত্তর এখনো অজানা।
এমডি রহমান
ফোন : +1 4647335595, ই-মেইল: protidhoni24@gmail.com