দৈনিক প্রতিধ্বনি ২৪ একটি আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য বাংলা অনলাইন নিউজ পোর্টাল। সঠিক, বস্তুনিষ্ঠ ও দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে পাঠকদের কাছে দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সব খবর পৌঁছে দেওয়াই আমাদের অঙ্গীকার।
২৯০৭ এডিসন অ্যাভিনিউ, ব্লু আইল্যান্ড, ইলিনয় ৬০৪০৬, যুক্তরাষ্ট্র
© ২০২৫ দৈনিক প্রতিধ্বনি ২৪। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
আপডেট :

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের মৃত্যুর গুঞ্জন ঘিরে আবারও শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক আলোচনা। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি ছড়িয়ে পড়ার পরই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে একটি প্রদর্শনী পরিদর্শনের ছবি প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। তবে প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্বের অন্যতম গোপনীয় রাষ্ট্রটির নেতাকে ঘিরে বারবার কেন এমন গুঞ্জন ছড়ায়?
উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনকে নিয়ে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া মৃত্যুর গুঞ্জনের মধ্যেই তাঁর বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র রোদং সিনমুন। ছবিতে ৪২ বছর বয়সী কিমকে বেশ স্বাভাবিক ও সুস্থ অবস্থায় দেখা গেছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, গত ১৯ অক্টোবর রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে পোশাক ও জুতার একটি প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন কিম। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন মেয়ে কিম জু অ্যাই এবং সরকারের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, মস্তিষ্কে গুরুতর রক্তক্ষরণের পর কোমায় চলে গেছেন কিম জং উন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কিমের মৃত্যুর খবরটি প্রথম ছড়ান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত চীনা ভিন্নমতাবলম্বী ওয়ানজুন শিয়ে। নিজেকে চীনা ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেওয়া শিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, উত্তর কোরিয়ার চিকিৎসাব্যবস্থা পর্যাপ্ত উন্নত না হওয়ায় গুরুতর অসুস্থ কিমকে বেইজিংয়ের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
তাঁর দাবি, সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিম মারা যান এবং পরে গোপনে তাঁর মরদেহ উত্তর কোরিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ক্ষমতাসীন সরকার বিষয়টি জনসাধারণের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কিন্তু এমন গুরুতর অভিযোগের সমর্থনে কোনো তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে পারেননি শিয়ে।
এর আগেও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মৃত্যু নিয়ে ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ২০ অক্টোবর উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে কিমের নতুন ছবি প্রকাশিত হয়। ছবিগুলোতে তাঁকে মেয়ের সঙ্গে প্রদর্শনী ঘুরে দেখতে এবং বিভিন্ন পণ্য পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়।
যদিও ছবিগুলো ঠিক কখন তোলা হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে কিমের মৃত্যুর দাবিকে সমর্থন করার মতো কোনো তথ্যও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দেশটির সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপকে জানিয়েছেন, কিমের মৃত্যু কিংবা গুরুতর অসুস্থতার বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিমের আকস্মিক মৃত্যু ঘটলে উত্তর কোরিয়ার বাইরেও তার কিছু লক্ষণ দেখা যাওয়ার কথা। বিশেষ করে চীন সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার, কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি কিংবা সম্ভাব্য শরণার্থী পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতির মতো ঘটনা ঘটতে পারত।
কিন্তু তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের খবর পাওয়া যায়নি।
কিম জং উনকে নিয়ে এমন গুঞ্জন এবারই প্রথম নয়।
২০২০ সালেও তাঁর হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচার ঘিরে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, কিমের মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি ৯৯ শতাংশ নিশ্চিত।
অথচ কিছুদিন পরই প্রকাশ্যে হাজির হন কিম। ফলে তাঁর মৃত্যুর খবরটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়।
এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির পেছনে উত্তর কোরিয়ার কঠোর গোপনীয়তাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা। দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যক্তিগত জীবন, স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
ফলে সামান্য অনুপস্থিতি কিংবা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা থেকেও বড় ধরনের গুঞ্জনের জন্ম হয়।
কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহের একটি বড় কারণ উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব।
দেশটিতে তিন প্রজন্ম ধরে ক্ষমতায় রয়েছে কিম পরিবার।
উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং দীর্ঘ সময় ধরে নিজের ছেলে কিম জং ইলকে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। ১৯৯৪ সালে কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর পর তাই নেতৃত্বের পরিবর্তন তুলনামূলক নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।
কিন্তু কিম জং উনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।
২০০৮ সালে তাঁর বাবা কিম জং ইল স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত কিম জং উনকে নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা হয়। ২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
এরপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দিতে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, কিম সম্ভবত তাঁর মেয়ে কিম জু অ্যাইকে ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করছেন।
মাত্র ১৩ বছর বয়সী জু অ্যাইকে সাম্প্রতিক সময়ে বাবার সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, সামরিক প্রদর্শনী ও গুরুত্বপূর্ণ সফরে দেখা যাচ্ছে।
তবে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়নি। তা ছাড়া উত্তর কোরিয়ার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো নারী সর্বোচ্চ নেতৃত্বে আসেননি।
ফলে কিমের অনুপস্থিতিতে ক্ষমতা কার হাতে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
কিম জং উনের স্বাস্থ্য সম্পর্কে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্বেগের কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে।
তিনি অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন এবং নিয়মিত ধূমপান করেন বলে জানা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা একাধিকবার জানিয়েছে, তাঁর জীবনযাপনের কারণে হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
কিম পরিবারের ইতিহাসেও হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঘটনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিমের আকস্মিক মৃত্যু কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা শুধু উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, পুরো পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
কারণ দেশটির হাতে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র।
হঠাৎ নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হলে এসব অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, ক্ষমতা নিয়ে সংঘাত শুরু হবে কি না, কিংবা সামরিক বাহিনীর কোনো অংশ আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেবে কি না—এসব প্রশ্ন আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগের কারণ।
এমন পরিস্থিতিতে চীন সীমান্তে শরণার্থী সংকট দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৮ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকায় সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগও স্বাভাবিক।
বিশ্বের সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রগুলোর একটি উত্তর কোরিয়া। দেশটির সংবাদমাধ্যম সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং শীর্ষ নেতৃত্বের বিষয়ে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
কিম জং উনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ পান হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তি।
এমনকি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেক সময় অনুমান ও পরোক্ষ তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার সরকার নিজেও কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করার চেষ্টা করতে পারে। তবে এমন কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়।
এই তথ্যসংকটের সুযোগে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা প্রচারের জন্য ভিত্তিহীন দাবি ছড়িয়ে দিতে পারেন।
ওয়ানজুন শিয়ের সাম্প্রতিক দাবির পেছনেও তেমন কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজর এড়িয়ে কিমের মৃত্যুর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর শুধু একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে যাওয়ার দাবি যথেষ্ট সন্দেহজনক।
সব মিলিয়ে, কিম জং উনের মৃত্যুর সাম্প্রতিক গুঞ্জনের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নতুন ছবি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তাদের বক্তব্য এ দাবিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তবে উত্তর কোরিয়ার অস্বচ্ছ রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা যত দিন থাকবে, তত দিন কিম জং উনের স্বাস্থ্য ও মৃত্যু ঘিরে এ ধরনের গুঞ্জন ফিরে আসার আশঙ্কাও থেকে যাবে।