দৈনিক প্রতিধ্বনি ২৪ একটি আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য বাংলা অনলাইন নিউজ পোর্টাল। সঠিক, বস্তুনিষ্ঠ ও দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে পাঠকদের কাছে দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সব খবর পৌঁছে দেওয়াই আমাদের অঙ্গীকার।
২৯০৭ এডিসন অ্যাভিনিউ, ব্লু আইল্যান্ড, ইলিনয় ৬০৪০৬, যুক্তরাষ্ট্র
© ২০২৫ দৈনিক প্রতিধ্বনি ২৪। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
আপডেট :

চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা আবার শুরু করতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে রাশিয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূতের সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকের পর এ ঘোষণা দিয়েছে ক্রেমলিন। আগামী নভেম্বরেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে নতুন দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে দুই পক্ষের বিপরীতমুখী দাবি এবং ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েনের মধ্যে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সঙ্গে স্থগিত শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করতে প্রস্তুত রাশিয়া। বুধবার (২১ অক্টোবর) দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শীর্ষ পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ এ কথা জানিয়েছেন।
রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে পুতিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর এ ঘোষণা আসে।
উশাকভ জানান, রাশিয়া নীতিগতভাবে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা পুনরায় শুরু করতে সম্মত হয়েছে। আগামী ১০ নভেম্বরের কাছাকাছি সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে নতুন দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে।
তবে আলোচনার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এবং প্রতিনিধিদলের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বুধবার সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য পথ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের উশাকভ বলেন, সংঘাত শেষ হওয়ার পর রাশিয়া ও ইউক্রেনের জন্য একটি কার্যকর নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিকে মস্কো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি জানান, যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করার শর্তে রাশিয়া আবারও আলোচনার টেবিলে বসতে প্রস্তুত।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অনুষ্ঠিত কয়েক দফা আলোচনা কোনো স্থায়ী সমাধান ছাড়াই স্থগিত হয়ে যায়।
গত মাসে রাশিয়ার সাধারণ নির্বাচনের সময় দেশটির বিভিন্ন স্থাপনায় ইউক্রেনের ব্যাপক হামলাকে আলোচনা ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ক্রেমলিন।
তবে কিয়েভ ও ইউরোপীয় মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরেই কোনো পূর্বশর্ত ছাড়া দ্রুত শান্তি আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়ে আসছে।
রাশিয়া সফরের আগে নরওয়ের রাজধানী অসলোতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন স্টিভ উইটকফ।
সেখানে নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে জানিয়েছেন, অসলোতে উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের নিয়ে কারিগরি পর্যায়ে নতুন ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তাব দেন।
মঙ্গলবার অসলোতে ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিরা প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন। পরদিন বুধবার সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়াও এতে সম্মতি জানায়।
ফলে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর তিন দেশের প্রতিনিধিদের আবারও একই আলোচনার টেবিলে বসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে অসলোতে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় নেতাদের দেওয়া প্রস্তাব সম্পর্কে খুব একটা ইতিবাচক মন্তব্য করেনি মস্কো।
রুশ প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা উশাকভ বলেছেন, এসব প্রস্তাবে ইউক্রেন সংকট সমাধানের জন্য খুব বেশি কার্যকর উপাদান পাওয়া যায়নি।
শান্তি আলোচনায় ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করলেও যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী অবস্থান ধরে রেখেছে ক্রেমলিন।
উশাকভ জানিয়েছেন, বৈঠকে পুতিন মার্কিন বিশেষ দূতকে বলেছেন, ইউক্রেনের বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রজুড়ে রুশ বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে এবং সামরিক অভিযানের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ এখন রাশিয়ার হাতে।
মস্কোর দাবি, তাদের সেনাবাহিনী বিভিন্ন ফ্রন্টে ধারাবাহিক সাফল্য পাচ্ছে।
তবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করছে ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা।
তাদের বক্তব্য, যুদ্ধক্ষেত্রের অধিকাংশ এলাকায় দুই পক্ষের অবস্থান প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে এবং বড় ধরনের কোনো সামরিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি রাশিয়া।
যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের বিপরীতমুখী অবস্থান শান্তি আলোচনার সম্ভাবনাকেও জটিল করে তুলছে।
রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা এড়িয়ে আসছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার ধারণা থেকেই মস্কো তাড়াহুড়া করে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহ দেখায়নি।
অন্যদিকে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট তৈরি হয়েছে।
এর ফলে বেসামরিক নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা প্রতিরোধ করা কিয়েভের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
শান্তি আলোচনায় নতুন উদ্যোগের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইউক্রেনের নেতৃত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছেন।
তিনি মন্তব্য করেছেন, ইউক্রেনের জন্য নতুন প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন এবং দেশটির পক্ষে শান্তি আলোচনা পরিচালনার দায়িত্ব অন্য কারও হাতে দেওয়া উচিত।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার পাশাপাশি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে আসছেন।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ কারণে দুই পক্ষের মধ্যে শান্তিচুক্তির শর্ত ও আলোচনার কৌশল নিয়ে মতপার্থক্য বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এই ইস্যু আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সম্প্রতি ট্রাম্প রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলার সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, এসব হামলা জ্বালানির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই চাপের মুখে থাকা জ্বালানি বাজারে ইউক্রেনের এই হামলাকে পরিস্থিতি আরও জটিল করার কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এতে ইউক্রেনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। এরপর থেকে চলমান সংঘাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়নি।
মূলত ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যতে ইউক্রেনের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে গভীর মতবিরোধ রয়েছে।
মস্কো চায়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাশিয়ার নিরাপত্তা স্বার্থকে স্বীকৃতি দিয়ে নতুন কাঠামো তৈরি করা হোক।
অন্যদিকে ইউক্রেন তার সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং ভবিষ্যতে রুশ আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইছে।
দুই পক্ষের এসব মৌলিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন না এলে শুধু আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত থেকে দ্রুত শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিন ও ট্রাম্পের বিশেষ দূতের বৈঠককে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে কয়েক মাসের বিরতির পর রাশিয়ার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করাকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
তবে রাশিয়া এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানের দাবি করছে। অন্যদিকে ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা মস্কোর ওপর চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা, ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কে টানাপোড়েন এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি।
ফলে আগামী নভেম্বরের সম্ভাব্য বৈঠক নতুন কূটনৈতিক পথ খুলে দিলেও তা যে দ্রুত যুদ্ধের অবসান ঘটাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
তবে দীর্ঘদিনের সংঘাত ও ব্যর্থ আলোচনার পর রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরার সম্ভাবনাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, তিন দেশের এই কূটনৈতিক উদ্যোগ বাস্তবে যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তির পথে কতটা এগোতে পারে।