আপডেট :

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বাংলাদেশে জরুরি নীতিগত আলোচনা শুরু করেছে সরকার। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বুধবার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে গড়ানোর পর এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সরকারের ভেতরে আলোচনা জোরদার হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণে বুধবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠক হবে। বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা অংশ নেবেন।
এর আগে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব পর্যবেক্ষণ ও করণীয় নির্ধারণে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং খাদ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ রয়েছেন।
৯ মার্চ কমিটি গঠনের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সরকার ইতিমধ্যে কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে চার কার্গো এলএনজি কেনার নির্দেশ, জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নির্দেশনা এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানোর মতো পদক্ষেপ রয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক সংঘাত চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংঘাতের শেষ কোথায় গিয়ে থামবে তা এখনো অনিশ্চিত। এরই মধ্যে সম্ভাব্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন দেশ সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।
বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তা বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
জরুরি নীতিগত বৈঠক
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, এই প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি পর্যালোচনায় বুধবার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে অর্থনীতি, জ্বালানি, বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এর আগে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির দায়িত্ব হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত কৌশল নির্ধারণ করা।
সরকারের চলমান কর্মসূচি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সরকারের প্রথম মাসে কয়েকটি বড় কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন প্রকল্প। ১৬ মার্চ দিনাজপুর থেকে প্রধানমন্ত্রী এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন এবং একযোগে ৪০ জেলায় কাজ শুরু হয়।
এ ছাড়া ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারে ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ও গির্জার যাজকদের জন্য মাসিক সম্মানী চালু করা হয়েছে।
সামাজিক কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক চাপ
সরকার কৃষি খাতে সহায়তা দিতে ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা পয়লা বৈশাখ থেকে চালু হওয়ার কথা। প্রাথমিক পর্যায়ে টাঙ্গাইলের ১১ উপজেলায় ২১ হাজার ৫০০ কৃষককে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বছরে আড়াই হাজার টাকা করে প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি পাইলট হিসেবে শুরু হয়েছে, যেখানে ৬ হাজার ৫০০ পরিবার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভবিষ্যতে এটি সারা দেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে।
জ্বালানি খাতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ
সরকার ইতিমধ্যে জ্বালানি খাতে কিছু জরুরি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে চার কার্গো এলএনজি কেনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা মজুত রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো এবং জ্বালানি তেল ক্রয়ে সীমা নির্ধারণের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কতটা চাপের মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি দ্রুতই অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি—এসব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বহুমুখী উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা গ্রহণ এবং কর ব্যবস্থায় সংস্কারের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো বজায় রাখার কথাও সরকার বলছে।
অন্যদিকে সমালোচকেরা মনে করেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়তে পারে, যা উন্নয়ন প্রকল্প ও সামাজিক কর্মসূচির বাস্তবায়নে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তাই নীতিনির্ধারণে দ্রুততা এবং অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দৈনিক প্রতিধ্বনি ২৪ একটি আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য বাংলা অনলাইন নিউজ পোর্টাল। সঠিক, বস্তুনিষ্ঠ ও দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে পাঠকদের কাছে দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সব খবর পৌঁছে দেওয়াই আমাদের অঙ্গীকার।
২৯০৭ এডিসন অ্যাভিনিউ, ব্লু আইল্যান্ড, ইলিনয় ৬০৪০৬, যুক্তরাষ্ট্র
© ২০২৫ দৈনিক প্রতিধ্বনি ২৪। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।